Information

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

ফররুখ আহমদের রচনাবলী
অধ্যাপক মুহম্মদ মতিউর রহমান
বিস্ময়ের বিষয় হলেও সত্য যে, ফররুখ আহমদ রচিত অর্ধশতাধিক গ্রন্থের মধ্যে মাত্র সামান্য কয়েকটি গ্রন্থই প্রকাশিত হয় তাঁর জীবনকালে। অথচ বেঁচে থাকতেই কবি অসাম্যান্য কবি-খ্যাতি ও জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন। তাঁর কাব্য প্রকাশে আগ্রহী প্রকাশকের সংখ্যাও কম ছিল না। এতৎসত্ত্বেও তাঁর অধিকাংশ রচনাই অপ্রকাশিত ছিল তাঁর জীবনকালে। এমনকি, তাঁর যে কয়টি গ্রন্থ তাঁর জীবনকালে প্রকাশিত হয়েছিল তার মধ্যে বেশ কয়টি গ্রন্থের সকল কপিই সম্পূর্ণ নিঃশেষিত হওয়া সত্ত্বেও সেগুলো পুনঃমুদ্রণের ব্যাপারে তাঁর তেমন কোন আগ্রহ দেখা যায় নি। এর মূলে সম্ভাব্য যেসব কারণ বিদ্যমান ছিল তা নিম্নরূপ :
প্রথমত, ফররুখ আহমদ স্বভাবগতভাবে ছিলেন প্রচার-বিমুখ। সৃষ্টি-কর্মে তিনি ছিলেন গভীরভাবে নিষ্ঠাবান। কিন্তু ব্যক্তিগত প্রচার-প্রচারণার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন নিতানত্ম নিস্পৃহ। এমনকি, দারিদ্র্য-পীড়িত, দুঃসহ দুঃখ-কষ্টের জীবনে আকর্ষণীয় পরিমাণ অর্থ-বৈভবের লোভও তাঁকে কখনো কোন প্রকার প্রচার-কর্মে নিয়োজিত করতে পারেনি। জাগতিক কোন লোভই তাঁকে তাঁর নীতি ও আদর্শ থেকে বিচু্যত করতে পারেনি। সৃষ্টি-কর্মে তিনি যেমন ছিলেন নিরলস সাধক, জাগতিক ব্যাপারে তিনি তেমনি ছিলেন অতিশয় নির্লোভ, স্বার্থহীন ও বিস্ময়কর রকম সাধু প্রকৃতির। তিনি মনে করতেন, প্রচারমুখিতা লেখকের সৃষ্টিশীলতা বিনাশ করে। এজন্য সাধারণত তিনি কোন সভা-সেমিনারের দাওয়াত গ্রহণ করতেন না। কোথাও কখনো কোন অনুষ্ঠানে গেলেও শেষের অথবা মাঝখানের কোন সারিতে বসে নীরব শ্রোতার ভূমিকা পালন করতেন। আত্ম-প্রচারে যথার্থ অনীহা তাঁর মহৎ শিল্প-স্বভাবের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ছিল। এ কারণে কোন একটি লেখা শেষ হলেই তা প্রকাশের জন্য পত্রিকা অফিসে ধর্ণা দেয়া অথবা একটি পাণ্ডুলিপি প্রস্তুত করেই তা প্রকাশের জন্য প্রকাশকের নিকট গিয়ে সাধাসাধি করা ফররুখের স্বভাবের মধ্যে ছিল না। তোয়াজ, তোষামোদ, চাটুকারিতা এগুলোর প্রতি ফররুখের চরম অনীহার কথা সর্বজনবিদিত। তিনি নিজে তো এগুলো করতেনই না, তাঁর কাছে কেউ এ রকম করলেও তিনি তাঁর উপর সম্ভব রকম ক্ষেপে যেতেন। তিনি ছিলেন কঠোর আত্মসম্মানবোধসম্পন্ন মহৎ শিল্পী, যিনি চরম দারিদ্র্য ও প্রতিকূল অবস্থায়ও কখনো কোন ব্যাপারে এতটুকু মাথা নত করতে বা আত্মসম্মান বিসর্জন দিতে জানতেন না। সব সময় আরবি আলিফ হরফের মত শিরদাড়া খাড়া রেখে চলতে অভ্যস্থ ছিলেন তিনি। এক্ষেত্রে আমাদের কবি-শিল্পী-সাহিত্যিকদের মধ্যে তিনি ছিলেন এক বিরল ব্যতিক্রম। তাঁর বইপুসত্মক বেশী প্রকাশিত না হবার পেছনে এটা ছিল অন্যতম কারণ। কিন্তু তা সত্ত্বে তাঁর এ প্রখর আত্মসম্মান বা আত্ম-সচেনতাবোধে আমাদের শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির জগতে এক অনুসরণযোগ্য বিরল দৃষ্টানত্ম হয়ে আছে। এজন্য তিনি দলমতনির্বিশেষে সকলের শ্রদ্ধা অর্জনে সক্ষম হয়েছিলেন।
দ্বিতীয়ত, সাহিত্য-কর্মে তিনি গভীর অনুশীলনের পক্ষপাতী ছিলেন। সাহিত্যের বিভিন্ন রূপরীতি ও শিল্প-সৌষ্ঠব সম্পর্কে তিনি যথেষ্ট সচেতন ছিলেন। কবিতার ভাব, ভাষা, বিষয়-বৈভব, ছন্দ, উপমা, উৎপ্রেক্ষা, আবেদন সৃষ্টির ক্ষেত্রে তাঁর শিল্প-সচেতন সংবেদনা ছিল অপরিসীম। তাই কোন কিছু লেখার পর সঙ্গে সঙ্গেই তা প্রকাশের জন্য তিনি ব্যসত্ম হয়ে পড়তেন না। প্রায়ই তিনি তা পুনঃলেখনের প্রয়াস পেয়েছেন। স্বীয় প্রতিভার প্রতি গভীর বিশ্বাস ও প্রখর শিল্প-সচেতনতা তাঁকে নিরনত্মর অনুপ্রাণিত করেছে স্বীয় সৃষ্টিকর্মকে তিল তিল করে সুসম্পন্ন ও নিখুঁত করে তোলার কাজে। অতুলনীয় অমর সৃষ্টির দিকেই কবির দৃষ্টি নিবদ্ধ ছিল। এ নিরনত্মর পরীক্ষা-নিরীক্ষা, অনুশীলন ও কবি-মনের সহজাত অতৃপ্তিই তাঁর কাব্য প্রকাশে অনেক সময় তাঁকে বিরত রেখেছে। তাঁর প্রতিটি লেখা ও গ্রন্থেই গভীর অনুশীলন, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও স্বসম্পাদনার লক্ষণ স্পষ্ট। তাঁর ইনত্মিকালের পর স্বহসত্মে লেখা তাঁর যেসব পাণ্ডুলিপি পাওয়া গেছে তা থেকে এটা প্রমাণিত হয় যে, কোন কিছু লেখার পর তিনি সেটা প্রায়ই বার বার কাটাকাটি করতেন।
মূলত তাঁর সব লেখাই স্বসম্পাদিত। আর শিল্পজ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তিরাই পারেন নিজের লেখার সম্পাদনা করতে। দেশী-বিদেশী বিভিন্ন উন্নতমানের সাহিত্য পাঠের ফলেই তাঁর মধ্যে এ শিল্প-সচেতনতার জন্ম হয়। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সাহিত্য প্রকৃতপক্ষে তার স্রষ্টার দ্বারা স্বসম্পাদিত। এ সম্পাদনার যোগ্যতা যার যত বেশি তিনি তত সার্থক। ফররুখ আহ্মদের মধ্যে এ পরিশীলিত উন্নত শিল্পবোধ থাকার কারণেই তাঁর লেখা প্রকাশে তিনি তাড়াহুড়া করতেন না। গ্রন্থের পাণ্ডুলিপি তৈরিতে তিনি প্রথমে নাম নির্বাচন, পরিকল্পিত গ্রন্থের অনত্মভর্ুক্ত কবিতার তালিকা তৈরি, সে তালিকা বার বার কাট-ছাট, গ্রহণ-বর্জন ইত্যাদি নিয়ে তিনি দীর্ঘকাল ধরে চিনত্মাভাবনা করতেন। এসব ব্যাপারে তাঁর তেমন কোন তাড়াহুড়া ছিল না।
তৃতীয়ত, অধিকাংশ পেশাদার প্রকাশকদের প্রতি কবির বড় একটা আস্থা ছিল না। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আমাদের দেশের প্রকাশকদের অনেকের মধ্যে সততার নিদারুণ অভাব। লেখকদেরকে নামমাত্র পয়সা দিয়ে অথবা না দিয়ে প্রকাশকরা পর্যাপ্ত বিত্ত-বৈভব এমনকি প্রচুর সুনাম-সুখ্যাতিরও অধিকারী হয়েছেন। লেখকরা সাধারণত গরিব, সংগতিপন্ন লেখকের সংখ্যা আমাদের দেশে খুবই কম। তাই অধিকাংশ প্রকাশক লেখকদের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে নানাভাবে তাদেরকে প্রতারিত করে থাকে। এরূপ বহু দৃষ্টানত্মই ফররুখ আহমদের সামনে ছিল। ফররুখ আহমদ এরূপ নীতিহীন প্রকাশকদেরকে সযত্নে এড়িয়ে চলতেন। দু'একটি ব্যতিক্রম ছাড়া সাধারণভাবে ফররুখ আহমদ প্রকাশকদের সম্পর্কে খুব একটা ভাল ধারণা পোষণ করতেন না। চিরকাল চরম দারিদ্র্যের সাথে সংগ্রাম করতে হয়েছে বলে তাঁর নিজের পক্ষেও গ্রন্থ প্রকাশের উদ্যোগ নেয়া সম্ভব ছিল না। তাই তাঁর জীবনকালে দু'একজন সৎ প্রকাশক এবং বাংলা একাডেমীর মাধ্যমে তাঁর স্বল্পসংখ্যক গ্রন্থই প্রকাশিত হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে একটি বিষয়ের উল্লেখ করা যায়। ষাটের দশকের শেষের দিকে ঢাকায় 'জাতীয় পুনর্গঠন বু্যরো' বা 'বু্যরো অব ন্যাশনাল রিকন্সস্ট্রাকশন' (বিএনআর) প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রখ্যাত ইসলামী চিনত্মাবিদ ও বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ডক্টর হাসান জামান এর পরিচালক নিযুক্ত হন। ডক্টর হাসান জামান কবি ফররুখ আহমদের আত্মীয় (ভাগিনেয়) ছিলেন। তিনি প্রকাশনা ক্ষেত্রে বলতে গেলে একটি বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন। অসংখ্য নবীন-প্রবীণ লেখকের প্রচুর বইপুসত্মক ছেপে আমাদের জ্ঞান ও সাহিত্যের ভাণ্ডারকে যেমন সমৃদ্ধ করেছেন, দলমতনির্বিশেষে সকল লেখকদের আর্থিক সহযোগিতা প্রদানেও তেমনি অসামান্য অবদান রেখেছেন। বলতে গেলে, আমাদের দেশের অধিকাংশ কবি-সাহিত্যিক-লেখক বিএনআর এবং ডক্টর হাসান জামানের কল্যাণে আর্থিকভাবে যথেষ্ট লাভবান হয়েছেন বা অনত্মত সাময়িক সমস্যার সমাধানে সক্ষম হয়েছেন। সর্বোপরি, যাঁদের নিজেদের বইপুসত্মক প্রকাশের সামর্থ্য ছিল না এবং প্রকাশকদের সুদৃষ্টি লাভ থেকেও যাঁরা বঞ্চিত ছিলেন, বিএনআর-এর মাধ্যমে রাতারাতি তাঁদের একাধিক বইপুসত্মক প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু ফররুখ আহমদ ছিলেন এক্ষেত্রেও এক বিরল ব্যতিক্রম। কেন, সে প্রসঙ্গেই বলছি।
ডক্টর হাসান জামান কবি ফররুখ আহমদের প্রকাশিত-অপ্রকাশিত গ্রন্থাদি প্রকাশের প্রসত্মাব নিয়ে স্বয়ং কবির বাসায় এসেছেন একাধিক বার। এজন্যে তাঁকে এক লক্ষ টাকা অগ্রিম রয়্যালটি প্রদানের প্রসত্মাবও দেয়া হয়েছে। কিন্তু প্রতিবারই কবি দৃঢ়ভাবে তা প্রত্যাখ্যান করেছেন। জাতীয় সাহিত্য-সংস্কৃতি ও শিল্পকলার বিকাশে সরকারী সহযোগিতা অপরিহার্য জ্ঞান করা সত্ত্বেও এক্ষেত্রে সরকারের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ-ব্যবস্থার নীতিকে কবি আনত্মরিকভাবে অপছন্দ করতেন। কারণ, তাতে এক ধরনের রেজিমেন্টশন বা প্রতিক্রিয়াশীলতা সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। বিএনআর তৎকালীন পাকিসত্মানের কেন্দ্রীয় সরকার কতর্ৃক প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং তৎকালীন সামরিক প্রেসিডেন্ট ফিল্ড মার্শাল আউয়ুব খানের ব্যক্তিগত আগ্রহে তা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। যদিও ডক্টর হাসান জামান সম্পূর্ণ স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবেই বু্যরোর কার্যক্রম পরিচালনা করেছিলেন তবু এ ধারণা তৎকালীন বুদ্ধিজীবী মহলে অনেকটা দানা বেঁধে উঠেছিল যে, মৌলিক গণতন্ত্রের দ্বারা গণতন্ত্রের কণ্ঠরোধ করার মত বিএনআর- এর দ্বারা সাহিত্য-সংস্কৃতি-শিল্পকলার স্বতঃস্ফূর্ত স্বাধীন বিকাশের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হচ্ছে। কবি এ ব্যাপারে ছিলেন অত্যনত্ম স্পর্শকাতর। তাই তিনি এ ধরনের বিতর্কিত বিষয়ের সাথে নিজেকে জড়াতে চাননি। মনে পড়ে, কবি এ প্রসঙ্গে একদিন তাঁর বৈঠক খানায় আমার সঙ্গে আলোচনা প্রসঙ্গে বলেছিলেন, "বিএনআর-এর পক্ষ থেকে গ্রন্থ প্রকাশ করে নিজেকে একজন 'সরকারি কবি' হিসাবে পরিচিত হতে দিতে চাই না। আমি চিরকালই স্বাধীনচেতা এবং সাধারণের একজন হয়ে আত্মপ্রকাশের প্রবল তাড়নায় উদ্বুদ্ধ হয়ে সাহিত্য-চর্চা করেছি, আমরণ আমি তাই করে যেতে চাই।"
এ কারণেই বিএনআর-এর পক্ষ থেকে তাঁর গ্রন্থ প্রকাশ এবং তার বিনিময়ে এককালীন মোটা অঙ্কের অর্থপ্রাপ্তির প্রসত্মাবকে তিনি নির্দ্বিধায় প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। ভাবতে বিস্ময় লাগে যে, পৃথিবীতে মাথা গুঁজবার মত এতটুকু ঠাঁই যার ছিল না, দিনানত্ম অক্লানত্ম পরিশ্রমের বিনিময়ে মাসানত্মে যে নগণ্য পরিমাণ বেতন আসতো, তা দিয়ে কায়ক্লেশে বারো সদস্যের বৃহৎ পরিবারের ভরণপোষণের ব্যবস্থা করাই যাঁর পক্ষে কঠিন ছিল, সেই দারিদ্র্য-পীড়িত দুর্বহ জীবনে বিপুল অর্থ-প্রাপ্তির সহজ সুযোগও তাঁকে তাঁর প্রবল নীতিবোধ থেকে এতটুকু বিচু্যত করতে পারেনি। অথচ নীতিবোধের ক্ষেত্রে এটা খুব যে একটা বড় সমস্যা ছিল তাও নয়। বিএনআর তখন আমাদের দেশেরই অন্যতম জাতীয় প্রতিষ্ঠান এবং জনগণের তথা সরকারের অর্থে তা পরিচালিত হতো। দলমত-নির্বিশেষে পরিচিত, অপরিচিত, স্বল্প পরিচিত, সুপরিচিত প্রায় সকল কবি-সাহিত্যিকই অর্থের প্রয়োজনে হোক, অথবা নিজেদের গ্রন্থ প্রকাশের তাগিদে হোক তখন বিএনআর-এর নিকট গিয়ে ধর্ণা দিয়েছেন। বিএনআর-এর পরিচালক ডক্টর হাসান জামান এমনই উদার প্রকৃতির মহৎ পণ্ডিত ব্যক্তি ছিলেন যে, পাণ্ডুলিপি জমা নিয়ে প্রথমেই তিনি তার উপর বিল করে লেখকের রয়্যালটির টাকা দেয়ার ব্যবস্থা করতেন, তারপর বই প্রকাশের ব্যবস্থা নিতেন। অনেক সময় অনেক গরিব-দুস্থ লেখককে তাঁর দুরবস্থার কথা শুনে অভিভূত হয়ে তাঁকে অগ্রিম টাকা দিয়ে বু্যরোতে পরে তাঁকে তাঁর কোন একটি পাণ্ডুলিপি জমা দিতে বলতেন। এভাবে অনেক গরিব দুঃস্থ লেখক তাঁদের সাময়িক অভাব-অনটন, ঋণ পরিশোধের দুঃসহ চিনত্মা, রোগাবস্থায় চিকিৎসা, কন্যাদায়ের ভাবনা থেকে বহুলাংশে নিষ্কৃতি পেয়েছেন। আমাদের দেশে এ ধরনের কোন কিছু কথা কল্পনাও করা যায় না। এখানে বহু সাধনার পর বই লিখে লেখক দিনের পর দিন বিভিন্ন প্রকাশকের নিকট ধর্ণা দিয়েও বই প্রকাশের সুযোগ পান না। ভাগ্যক্রমে কেউ কখনো সুযোগ পেলেও রয়্যালটির টাকা পেতে জীবনটাই কাবার হবার যোগাড় হয়। ফলে তার লেখার উৎসাহটাই নষ্ট হয়ে যায়। এক্ষেত্রে ডক্টর হাসান জামান যে এক বিরল ব্যতিক্রমী ধারা সৃষ্টি করতে চেয়েছিলেন তাতে কোন সন্দেহ নেই। আমাদের প্রকাশনা-শিল্পে এটা ছিল এক অভূতপূর্ব বিপ্লবাত্মক ঘটনা।
এসব প্রশংসনীয় দিক থাকা সত্ত্বেও, জাতীয় ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিবহ বাংলা একাডেমীকে প্রকারানত্মরে উপেক্ষা করে সরাসরি কেন্দ্রীয় সরকারের উদ্যোগে বিএনআর গঠন এবং আমাদের সাহিত্য-সংস্কৃতির বিকাশে সরকারী রেজিমেন্টেশন ও নিয়ন্ত্রণ চাপিয়ে দেয়ার সূক্ষ্ম প্রয়াস বলে অনেকেই মনে করতেন। এ কারণেই প্রবল আত্মমর্যাদাবোধসম্পন্ন এবং স্বাধীনচেতা কবি ফররুখ আহমদ এ ধরনের সরকারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তাঁর গ্রন্থ প্রকাশে আগ্রহী ছিলেন না। তাই ডক্টর হাসান জামানের আনত্মরিক প্রসত্মাবেও তিনি কখনও সাড়া দেননি। তবে তাঁর অনুরোধ-উপরোধ উপেক্ষা করতে না পেরে কবি শেষ পর্যনত্ম বেনামিতে লেখা মঙ্গল কাব্য ঢংয়ের তাঁর তিনটি ব্যঙ্গ কাব্য উক্ত প্রতিষ্ঠানকে প্রকাশের জন্য দিয়েছিলেন। আমি তখন কবির সানি্নধ্য লাভের আশায় প্রায় প্রতি সন্ধ্যায় তাঁর বাসায় যেতাম। কবি সোৎসাহে তাঁর ঐ তিনটি কাব্যের অংশবিশেষ আমাকে পড়ে শুনাতেন। তাঁর ব্যঙ্গ-বিদ্রূপাত্মক লেখার মধ্যে যে তীক্ষ্নতা রয়েছে তাঁর পড়ার ভঙ্গি, আর চোখ-মুখের ভঙ্গি আর দীপ্তির মধ্যে তার চেয়ে অনেক বেশী তীক্ষ্নতা আমি অনুভব করেছি। ঘটনাচক্রে আমি সেদিন বিকেলে কবির বৈঠকখানায় উপস্থিত ছিলাম। আমার উপস্থিতিতেই ডক্টর হাসান জামান এলেন কবির বাসায়। তিনি বিদায় হবার আগে কবি পাণ্ডুলিপি তিনটি তাঁর হাতে তুলে দিলেন। দুর্ভাগ্যবশত এর কিছুদিন পরই বিএনআর বন্ধ হয়ে যায়। ফলে বই দুটি প্রকাশিত হয়েছিল কিনা অথবা পাণ্ডুলিপিগুলো উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছিল কিনা জানি না।
যাই হোক, প্রকাশক ও প্রকাশনা-শিল্পের সাথে জড়িত ব্যক্তিদের প্রতি এরূপ নিঃস্পৃহ ও নেতিবাচক ধারণার ফলেই কবির জীবনকালে তাঁর অধিকাংশ লেখাই গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হতে পারেনি। ফলে তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের তুলনায় অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপির সংখ্যা অনেক বেশী। এখানে তাঁর গ্রন্থাবলির একটি তালিকা প্রণয়নের চেষ্টা করা হলো। কবির জীবদ্দশায় যেসব গ্রন্থ প্রকাশিত হয় তার একটি তালিকা নিম্নরূপ :
০১. সাত সাগরের মাঝি। প্রথম প্রকাশ ঃ ডিসেম্বর ১৯৪৪। প্রকাশক ঃ বেনজীর আহমদ, নওরোজ পাবলিশিং হাউজ, ১০৬-এ সার্কাস রোড, কলকাতা। মূল্য ঃ দুই টাকা। প্রচ্ছদ শিল্পী ঃ জয়নুল আবেদীন। (দ্বিতীয় সংস্করণ) তমদ্দুন সংস্করণ ঃ সেপ্টেম্বর ১৯৫২। রচনাকাল ঃ ১৯৪৩-৪৪। প্রকাশক ও মুদ্রাকর ঃ তৈয়েবুর রহমান, এম.এ, তমদ্দুন প্রেস, ৫০ লালবাগ রোড, ঢাকা, পূর্ব পাকিসত্মান। দাম ঃ দু'টাকা আট আনা। প্রচ্ছদ শিল্পী ঃ কামরুল হাসান। পৃষ্ঠা ঃ ৮৩।
০২. আজাদ করো পাকিসত্মান (ভেতরের পৃষ্ঠায় লেখা আছে ঃ আজাদ করো পাকিসত্মান। ফৌজের গান ও অন্যান্য কবিতা)। প্রথম সংস্করণ ঃ ১৯৪৬। প্রকাশক ঃ কাজি আফসার উদ্দিন আহমদ ও এস.এম. বজলুল হক, মৃত্তিকা গ্রন্থনি বিভাগ, ১০-বি তারক দত্ত রোড, বালিগঞ্জ, কলকাতা। মুদ্রাকর ঃ কালিপদ নাগ, ভারতী প্রেস, ৫ সানিআত সেন স্ট্রিট, কলকাতা। মূল্য ঃ রাজ সংস্করণ ঃ এক টাকা, সুলভ সংস্করণ ঃ আট আনা। ক্রাউন সাইজ, পৃষ্ঠা ঃ ২০।
০৩. সিরাজাম মুনীরা। প্রথম সংস্করণ ঃ সেপ্টেম্বর ১৯৫২। রচনাকাল ঃ ১৯৪৩-৪৬। প্রকাশক ও মুদ্রাকর ঃ তৈয়েবুর রহমান, এম.এ, তমদ্দুন প্রেস, লালবাগ, রোড, পূর্ব পাকিসত্মান। দাম ঃ দু'টাকা আট আনা। ডিমাই সাইজ, পৃষ্ঠা ঃ ৮৮।
০৪. নৌফেল ও হাতেম। প্রথম প্রকাশ ঃ জুন ১৯৬১। প্রকাশক ঃ পাকিসত্মান লেখক সংঘের পক্ষে_ ডক্টর কাজী মোতাহার হোসেন, বর্ধমান হাউস, ঢাকা-২। মূল্য ঃ দু'টাকা পঞ্চাশ ফয়সা। প্রচ্ছদশিল্পী ঃ নূরুল ইসলাম আলপনা। দ্বিতীয় সংস্করণ ঃ ডিসেম্বর ১৯৬৫। তৃতীয় সংস্করণ ঃ জানুয়ারি ১৯৬৭। প্রকাশক ঃ মোহাম্মদ নাসির আলী।, নওরোজ কিতাবিসত্মান, ৪৬ বাংলাবাজার, ঢাকা-১। চতুর্থ সংস্করণ ঃ আগস্ট ১৯৬৭। প্রকাশক ঃ মহিউদ্দীন আহমদ, আহমদ পাবলিশিং হাউস, ৭ জিন্দাবাহার প্রথম লেন, ঢাকা-১। মূল্য ঃ তিন টাকা। পৃষ্ঠা ঃ ৪+৯২।
০৫. মুহূর্তের কবিতা। প্রথম প্রকাশ ঃ সেপ্টেম্বর ১৯৬৩। প্রকাশক ঃ এফ. আহমদ, বার্ডস অ্যান্ড বুকস্, ৪ ফোল্ডার স্ট্রিট, ঢাকা-৩। মুদ্রক ঃ এম. এ. কাদের, দি ইম্পিরিয়াল প্রেস, ১০ হাটখোলা রোড, ঢাকা-৩। মূল্য ঃ তিন টাকা। প্রচ্ছদ শিল্পী ঃ কাইয়ুম চৌধুরী। পৃষ্ঠা ঃ ৮+১০০।
০৬. ধোলাই কাব্য। ফররুখ আহমদের ছদ্মনামে লেখা ব্যঙ্গ কবিতার সংকলন। সংগ্রহ ও সম্পাদনায় ঃ ফারুক মাহমুদ। প্রথম প্রকাশ ঃ জানুয়ারি ১৯৬৩। পরিবেশনায় ঃ নয়া দুনিয়া পাবলিকেশন্স, ১৪৩ বংশাল রোড, ঢাকা-১। প্রচ্ছদ ঃ মুহম্মদ আলী ও আব্দুস সাদেক। দাম ঃ দু'টাকা। পৃষ্ঠা ঃ ৭২।
০৭. হাতেম তা'য়ী। প্রথম প্রকাশ ঃ মে ১৯৬৬। প্রকাশক ঃ বাংলা একাডেমী, ঢাকা। মুদ্রক ঃ এ্যাবকো প্রেস, ৬/৭ আওলাদ হোসেন লেন, ঢাকা-১। প্রচ্ছদশিল্পী ঃ আব্দুর রউফ। মূল্য ঃ আট টাকা। পৃষ্ঠা ঃ ৮+৩২৮।
০৮. পাখির বাসা। প্রথম প্রকাশ ঃ ১৯৬৫। প্রকাশক ঃ বাংলা একাডেমী, ঢাকা। প্রচ্ছদ ও অঙ্গসজ্জা ঃ কাজী আবুল কাসেম।
০৯. হফরের ছড়া। প্রথম প্রকাশ ঃ মার্চ ১৯৬৮। প্রকাশক ঃ বাংলা একাডেমী, ঢাকা। প্রচ্ছদ ও অঙ্গসজ্জা ঃ এ, মুক্তাদির। মুদ্রক ঃ পাইওনিয়ার প্রেস, ঢাকা। দাম ঃ এক টাকা পঞ্চাশ পয়সা। পৃষ্ঠা ঃ ২৬।
১০. নতুন লেখা। প্রথম প্রকাশ ঃ ১৯৬৯। প্রকাশক ঃ আহমদ পাবলিশিং হাউস, ঢাকা।
১১. ছড়ার আসর (১)। প্রথম প্রকাশ ঃ ১৯৭০। এ ছাড়া ছোটদের উপযোগী কয়েকটি পাঠ্যবই কবির জীবদ্দশায় প্রকাশিত হয়। এগুলো হলো :
১২. নয়া জামাত (প্রথম ভাগ)। প্রথম প্রকাশ ঃ সেপ্টেম্বর ১৯৫০। দ্বিতীয় মুদ্রণ ঃ ডিসেম্বর ১৯৫০। তৃতীয় মুদ্রণ ঃ ফেব্রুয়ারি ১৯৫১। প্রকাশক ঃ মুখ্দুমী এ্যান্ড আহসানউল্লাহ লাইব্রেরি, বাবুবাজার, ঢাকা। মুদ্রক ঃ শ্রীনাথ প্রেস, ঢাকা। প্রচ্ছদ শিল্পী ঃ কামরুল হাসান। মূল্য ঃ এক টাকা চার আনা। পৃষ্ঠা ঃ ৮৪। ইস্ট বেঙ্গল টেঙ্ট কমিটি কতর্ৃক পঞ্চম শ্রেণীর জন্য অনুমোদিত, ঢাকা গেজেট ১৮-১-৫১।
১৩. নয়া জামাত (দ্বিতীয় ভাগ)। প্রথম প্রকাশ ঃ সেপ্টেম্বর ১৯৫০। দ্বিতীয় মুদ্রণ ঃ জানুয়ারি ১৯৫১। প্রকাশক ঃ ঐ। প্রচ্ছদশিল্পী ঃ ঐ। মূল্য ঃ এক টাকা ছয় আনা। পৃষ্ঠা ঃ ৭২+২৬। টেঙ্ট বুক কমিটি কতর্ৃক ষষ্ঠ শ্রেণীর জন্য অনুমোদিত।
১৪. নয়া জামাত (তৃতীয় ভাগ)। প্রথম প্রকাশ ঃ সেপ্টেম্বর ১৯৫০। পৃষ্ঠা ঃ ৮৬+৩৭। সপ্তম শ্রেণীর জন্য লিখিত বাংলা সাহিত্য। প্রকাশক ঃ ঐ। প্রচ্ছদশিল্পী ঃ ঐ।
১৫. নয়া জামাত (চতর্ুথ ভাগ)। প্রথম প্রকাশ ঃ সেপ্টেম্বর ১৯৫০। দ্বিতীয় মুদ্রণ ঃ ডিসেম্বর ১৯৫০। পৃষ্ঠা ঃ ৯৬+৬৪। প্রকাশক ঃ ঐ। প্রচ্ছদশিল্পী ঃ ঐ। টেঙ্ট বুক কমিটি কতর্ৃক অষ্টম শ্রেণীর জন্য অনুমোদিত।
কবির ইনত্মিকালের পর তাঁর যেসব গ্রন্থ প্রকাশিত বা পুনঃমুদ্রিত হয় তা নিম্নরূপ :
০১. ফররুখ আহমদের শ্রেষ্ঠ কবিতা। প্রথম প্রকাশ ঃ জুন ১৯৭৫। সম্পাদক ঃ আব্দুল মান্নান সৈয়দ। প্রকাশক ঃ মুহম্মদ ফাওজুল কবির খান, ফররুখ স্মৃতি তহবিলের পক্ষে। মুদ্রক ঃ বাংলা একাডেমীর মুদ্রণ বিভাগ। প্রচ্ছদ পরিকল্পক ঃ ফজল শাহাবুদ্দীন। মূল্য ঃ পনেরো টাকা। পৃষ্ঠা ঃ ১৬+৮৮।
০২. সাত সাগরের মাঝি। তৃতীয় সংস্করণ ঃ জ্যৈষ্ঠ ১৩৭২ (১৯৭৫)। প্রকাশক ঃ ইফতেখার রসুল জর্জ, নওরোজ কিতাবিসত্মান, ৪৬ বাংলাবাজার, ঢাকা। মুদ্রক ঃ এম. আলম, ইডেন প্রেস, ৪১/এ হাটখোলা রোড, ঢাকা। চিত্র ঃ ড. নওয়াজেশ আহমদ। মূল্য ঃ নয় টাকা। পৃষ্ঠা ঃ ১০১। পরিশিষ্টে মুজীবুর রহমান খাঁ_রচিত 'সাত সাগরের মাঝি_নারঙ্গী বনে কাঁপছে সবুজ পাতা' শীর্ষক প্রবন্ধ সনি্নবেশিত। চতুর্থ সংস্করণ ঃ ১০ জুন ১৯৯০। প্রকাশক ঃ নলেজ হোম, ১৪৬ গভর্নমেন্ট নিউমার্কেট, ঢাকা-১২০৫। মুদ্রক ঃ শিল্পতরু, ২৯০ সোনারগাঁ রোড, ঢাকা-১২০৫। প্রচ্ছদ ঃ শিবনাথ বিশ্বাস। মূল্য ঃ পঁয়ত্রিশ টাকা। পৃষ্ঠা ঃ ৬৪।
০৩. হফরের ছড়া। দ্বিতীয় সংস্করণ ঃ ১৯৭৬।
০৪. হে বন্য স্বপ্নেরা। প্রথম প্রকাশ ঃ নভেম্বর ১৯৭৬। কবি-পরিকল্পিত। সম্পাদক ঃ জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী। প্রকাশক ঃ মুহম্মদ ফাওজুল কবির খান, ফররুখ আহমদ কেন্দ্রীয় স্মৃতি সংসদের পক্ষে। মুদ্রক ঃ বাংলা একাডেমী মুদ্রণ শাখা। প্রচ্ছদশিল্পী ঃ কাইয়ুম চৌধুরী। মূল্য ঃ আট টাকা। পৃষ্ঠা ঃ ৫৩।
০৫. মুহূর্তের কবিতা। কবি-কৃত পরিমার্জিত দ্বিতীয় সংস্করণ ঃ অক্টোবর ১৯৭৮। সম্পাদক ঃ জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী। প্রকাশক ও মুদ্রক ঃ তাজুল ইসলাম, বর্ণ মিছিল, ৬৫ প্যারিদাস রোড, ঢাকা-১। প্রচ্ছদশিল্পী ঃ কাইয়ুম চৌধুরী। মূল্য ঃ দশ টাকা। পৃষ্ঠা ঃ ১০১।
০৬. ফররুখ রচনাবলী (প্রথম খণ্ড)। প্রথম প্রকাশ ঃ অক্টোবর ১৯৭৯। সম্পাদক ঃ মোহাম্মদ মাহ্ফুজউল্লাহ্ ও আব্দুল মান্নান সৈয়দ। প্রকাশক ঃ বাংলা একাডেমীর পক্ষে মহিউদ্দীন আহমদ, আহমদ পাবলিশিং হাউস, ৭ জিন্দাবাহার, প্রথম লেন, ঢাকা। মুদ্রক ঃ মানিকলাল শর্মা, মনোরম মুদ্রায়ণ, ১৪ শ্রীশ দাস লেন, ঢাকা-১। প্রচ্ছদশিল্পী ঃ কাইয়ুম চৌধুরী। মূল্য ঃ পঁয়ত্রিশ টাকা। পৃষ্ঠা ঃ ১২+৩৮৮।
০৭. ইকবালের নির্বাচিত কবিতা। প্রথম প্রকাশ ঃ জুন ১৯৮০। প্রকাশক ঃ ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, রাজশাহী। ভূমিকা ও পরিশিষ্ট ঃ মোহাম্মদ মাহ্ফুজউল্লাহ্। প্রচ্ছদ ঃ আব্দুর রউফ সরকার। পৃষ্ঠা ঃ ১৬+৮০+৫। দাম ঃ দশ টাকা।
০৮. চিড়িয়াখানা। প্রথম প্রকাশ ঃ ১০ জুন ১৯৮০। প্রকাশক ঃ ঐ। মুদ্রক ঃ ওরিয়েন্টাল প্রিন্টার্স লিঃ, চট্টগ্রাম। প্রচ্ছদ ও অঙ্গসজ্জা ঃ সবিহ্-উল-আলম। মূল্য ঃ পনেরো টাকা।
০৯. নয়া জামাত। প্রথম প্রকাশ ঃ নভেম্বর ১৯৭৮। সংকলক ঃ মাসুদ আলী। প্রকাশক ঃ আধুনিক প্রকাশনী, ১৩/৩ প্যারিদাস রোড, ঢাকা-১। মুদ্রক ঃ পয়গাম প্রেস, ৯ গোপীকিষণ লেন, ঢাকা-৩। প্রচ্ছদ ও অঙ্গসজ্জা ঃ আব্দুর রউফ সরকার। মূল্য ঃ সুলভ ছয় টাকা, শোভন সাত টাকা, পৃষ্ঠা ঃ ৬৪।
১০. কাফেলা। প্রথম প্রকাশ ঃ আগস্ট ১৯৮০। দ্বিতীয় মুদ্রণ ঃ ১৯৮৭। প্রকাশক ঃ ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ঢাকা। ভূমিকা : মোহাম্মদ মাহ্ফুজউল্লাহ্। প্রথম সংস্করণের মূল্য ঃ আট টাকা, দ্বিতীয় সংস্করণের মূল্য ঃ বিশ টাকা।
১১. হাবেদা মরুর কাহিনী। প্রথম প্রকাশ ঃ সেপ্টেম্বর ১৯৮১। প্রকাশক ঃ ঐ। মুদ্রক ঃ খেয়ালি প্রেস, ঢাকা। ভূমিকা : ঐ। মূল্য ঃ দশ টাকা। পৃষ্ঠা ঃ ৮৪।
১২. সিন্দাবাদ। প্রথম প্রকাশ ঃ অক্টোবর ১৯৮৩। প্রকাশক ঃ ঐ। সম্পাদক ঃ আখতার-উল-আলম।
১৩. ফুলের জলসা। প্রথম প্রকাশ ঃ ডিসেম্বর ১৯৮৫। প্রকাশক ঃ বাংলাদেশ শিশু একাডেমী, ঢাকা। ছবি ঃ শওকতুজ্জামান। দাম ঃ আট টাকা। পৃষ্ঠা ঃ ২৪।
১৪. তসবিরনামা। প্রথম প্রকাশ ঃ ডিসেম্বর ১৯৮৬। প্রকাশক ঃ নয়া দুনিয়া পাবলিকেশন্স, ৪৭ নর্থব্রুক হল রোড, বাংলাবাজার, ঢাকা-১। প্রচ্ছদ ঃ আব্দুর রউফ সরকার। মুদ্রক ঃ দিনকাল মুদ্রায়ণ, ঢাকা। মূল্য ঃ বিশ টাকা। পৃষ্ঠা ঃ ৫৬।
১৫. কিস্সা কাহিনী। প্রথম প্রকাশ ঃ এপ্রিল ১৯৮৪। প্রকাশক ঃ ইসলামিক ফাউন্ডেশন, বায়তুল মোকাররম, ঢাকা-২। মুদ্রক ঃ ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রেস, বায়তুল মোকাররম, ঢাকা-২।
১৬. ধোলাই কাব্য। দ্বিতীয় সংস্করণ ঃ ১৯৮৬। ফররুখ আহমদ লিখিত ভূমিকা সংযোজিত। ভূমিকায় কবি এটিকে 'ধোলাই কাব্যের পরিবর্তিত, পরিবর্ধিত, পরিমার্জিত_অতীব পরিষ্কার সংস্করণ', 'সহীহ বড় সংস্করণ' বলে উল্লেখ করেছেন।
১৭. মহফিল (প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড)। প্রথম প্রকাশ ঃ ডিসেম্বর ১৯৮৭। প্রকাশক ঃ ইসলামিক ফাউন্ডেশন, বায়তুল মোকাররম, ঢাকা-২। প্রচ্ছদ ঃ আব্দুর রউফ সরকার। মূল্য ঃ বিশ টাকা।
১৮. ফররুখ আহমদের গল্প। প্রথম প্রকাশ ঃ জানুয়ারি ১৯৯০। সম্পাদক ঃ আব্দুল মান্নান সৈয়দ। প্রকাশক ঃ সৃজন প্রকাশনী লিঃ, ৯৯ মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা, করিম চেম্বার (৫ম তলা), ঢাকা-১০০০। প্রচ্ছদ ঃ মোমিন উদ্দীন খালেদ। মূল্য ঃ চলি্লশ টাকা। পৃষ্ঠা ঃ ৮০।
১৯. নির্বাচিত কবিতা। প্রথম প্রকাশ ঃ জানুয়ারি ১৯৯৫। সম্পাদক ঃ ঐ। প্রকাশক ঃ বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র, ১৪ কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ, ঢাকা-১০০০। প্রচ্ছদ ঃ শিবনাথ বিশ্বাস। মূল্য ঃ পঞ্চাশ টাকা। পৃষ্ঠা ঃ ৮০।
২০. ঐতিহাসিক-অনৈতিহাসিক কাব্য। প্রথম প্রকাশ ঃ ১৯৯১।
২১. দিলরুবা। প্রথম প্রকাশ ঃ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৪। প্রকাশক ঃ আমিরুল ইসলাম, চট্টগ্রাম সংস্কৃতি কেন্দ্রের পক্ষে। ভূমিকা : আব্দুল মান্নান সৈয়দ। প্রচ্ছদ ও অলংকরণ ঃ মোমিন উদ্দীন খালেদ। মূল্য ঃ ষাট টাকা। পৃষ্ঠা ঃ ৮৪।
২২. ফররুখ আহমদ রচনাবলী (প্রথম খণ্ড)। প্রথম প্রকাশ ঃ জুন ১৯৯৫। প্রকাশক ঃ বাংলা একাডেমী, ঢাকা। আব্দুল মান্নান সৈয়দ সম্পাদিত। প্রচ্ছদ ঃ কাইয়ুম চৌধুরী। মূল্য ঃ দুইশত পঞ্চাশ টাকা। পৃষ্ঠা ঃ ৩২+৬০৫।
২৩. ফররুখ আহমদ রচনাবলী (দ্বিতীয় খণ্ড)। প্রথম প্রকাশ ঃ জুন ১৯৯৬। প্রকাশক ঃ ঐ। সম্পাদনা ঃ ঐ। প্রচ্ছদ ঃ ঐ। মূল্য ঃ দুইশত টাকা। পৃষ্ঠা ঃ ৩৯+৫০৪।
২৪. সিরাজাম মুনীরা। ফররুখ একাডেমী সংস্করণ (সৈয়দ আলী আহসানের ভূমিকা ও মুহম্মদ মতিউর রহমান রচিত প্রসঙ্গ কথা সংযুক্ত), সেপ্টেম্বর, ২০০০। প্রকাশক ঃ ফররুখ একাডেমী, প্রচ্ছদ ঃ রফিকুল্লাহ গাজ্জালী। মূল্য ঃ ষাট টাকা। পৃষ্ঠা ঃ ৮০।
এছাড়া, ফররুখ আহমদ রচিত আরো যেসব পাণ্ডুলিপির পরিচয় পাওয়া যায়, তার একটি তালিকা নিম্নরূপ :
১। অনুস্বর (ব্যঙ্গ কবিতা) রচনাকাল ঃ ১৯৪৪-৪৬, ২। বিসর্গ (ব্যঙ্গ কবিতা) রচনাকাল ঃ ১৯৪৬-৪৮, ৩। হাল্কা লেখা, ৪। তস্বিরনামা, ৫। রসরঙ্গ, ৬। রক্ত গোলাব (গানের সংকলন), ৭। কাব্যগীতি, ৮। রাজ-রাজরা (গদ্য ব্যঙ্গ নাটিকা), ৯। ছড়ার আসর (২), ১০। ছড়ার আসর (৩), ১১। সাঁঝ সকালের কিস্সা, ১২। আলোকলতা, ১৩। খুশির ছড়া, ১৪। মজার ছড়া, ১৫। পাখির ছড়া, ১৬। রং মশাল, ১৭। জোড় হরফের ছড়া, ১৮। পড়ার শুরু, ১৯। পোকামাকড়, ২০। কুরআন মঞ্জুষা, ২১। আমপারা (কুরআন শরিফের ২৯টি সূরার অনুবাদ), ২২। সিকান্দার শা'র ঘোড়া (একটি অসম্পূর্ণ উপন্যাস), 'মৃত্তিকা' পত্রিকার আষাঢ়-শ্রাবণ, ১৩৫৩ সংখ্যায় 'এ কোন দেশ' ও 'সীমানা' _ এ শিরোনামে উক্ত উপন্যাসের আংশিক প্রকাশিত হয়েছিল।
এছাড়া, ফররুখ আহমদের কিছু প্রবন্ধ রয়েছে যা আজও পুসত্মকাকারে প্রকাশিত বা গ্রন্থিত হয় নি। তাঁর রচিত বইয়ের উপরোক্ত তালিকা যে সম্পূর্ণ তাও নিঃসন্দেহে বলা কঠিন। ফররুখ আহমদ বিশ্ববিখ্যাত কয়েকজন উদর্ু ও ফারসি কবির কবিতাও অনুবাদ করেছেন। এর মধ্যে পাকিসত্মানের দার্শনিক কবি ইসলামী পুনর্জাগরণের অন্যতম দিশারি মহাকবি আল্লামা ইকবাল, পাকিসত্মানের মরমি কবি শাহ আব্দুল লতিফ ভিটাই, প্রখ্যাত উদর্ু কবি আলতাফ হোসেন হালী এবং ইরানের বিশ্ববরেণ্য সুফী কবি হাফিজ ও শেখ সাদী (রহঃ)-এর নাম সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। কবির এ-সকল অনুবাদ কবিতার সবগুলোই বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় ছাপা হয়েছে, অন্যান্য কবির অনূদিত বিভিন্ন কবিতার সংকলনেও স্থান পেয়েছে। তবে সবগুলো কবিতা গ্রন্থবদ্ধ হয়েছে কিনা তা নিঃসন্দেহে বলা কঠিন। অনুবাদ কবিতার মধ্যে তাঁর নিজস্ব বৈশিষ্ট্য সুস্পষ্ট। এগুলোর মধ্যেও তাঁর প্রতিভার স্ফূরণ ঘটেছে।
কবির প্রকাশিত-অপ্রকাশিত রচনাবলীর উপরোক্ত তালিকা থেকে তাঁর প্রতিভার বিশালত্ব, রচনার বৈচিত্র্য ও বিষয়বস্তুর ব্যাপকতা সম্পর্কে সহজেই ধারণা করা চলে। ফররুখ আহমদ ছিলেন অত্যনত্ম শিল্প-সচেতন। বিভিন্ন ভাষার সাহিত্য বিশেষত বিশ্ব-বরেণ্য কবি-সাহিত্যিকদের সুবিখ্যাত-কর্মের সাথে তাঁর পরিচয় ছিল। তিনি সেসব সাহিত্যের ভাব, শিল্প-কুশলতা, বর্ণনাভঙ্গী ও সাফল্য সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা নিয়ে বাংলা ভাষার যথার্থ শিল্প-সুন্দর সাহিত্য-সম্ভার উপহার দিয়েছেন। কিন্তু তাই বলে তিনি কখনো কাউকে অনুকরণ করেননি। যথার্থ মৌলিক প্রতিভা কখনো কাউকে অনুকরণ করে না। তবে তাঁরা উৎকৃষ্ট উদাহরণ ও অনুপ্রেরণা গ্রহণ করে থাকে এবং শিল্প-প্রকরণগত বিভিন্ন ভঙ্গি ও দৃষ্টিকে কাজে লাগিয়ে থাকে। ফররুখ আহমদ ছিলেন এক যথার্থ সৃষ্টিশীল মৌলিক প্রতিভার অধিকারী কবি। তিনি তাঁর ভাব, ভাষা, ব্যঞ্জনা ও আবেদনের দিক দিয়ে কাব্যের এক মহীয়ান, দীপ্তিমান, স্বতন্ত্র ভুবন নির্মাণে সক্ষম হয়েছেন। কবি হিসাবে এটা তাঁর অনন্য-উজ্জ্বল বৈশিষ্ট্য।
ফররুখ আহমদের কাব্যের বর্ণনা, বিষয় ও উপজীব্য বহু বিচিত্র। তাঁর কাব্যে একদিকে যেমন বাংলার সবুজ প্রকৃতি, নানা ফসলে পূর্ণ মাঠ, নদী-নালা, ফুলের সুবাস, পাখির কল-কাকলি রয়েছে, তেমনি রয়েছে দিগনত্ম-বিসত্মারী, ধূসর মরুভূমি, আরব জনপদ, ঝড়-গতিসম্পন্ন তাজী ঘোড়া, 'মরুভুমির জাহাজ' নামে খ্যাত দ্রম্নত গতির উট, দিগনত্ম বিসত্মারী সবুজ খেজুর বীথি ও সে দেশের বিচিত্র মানুষের জীবনত্ম প্রতিকৃতি। এবং আরো রয়েছে দিগনত্ম-ছোঁয়া নীল সমুদ্র, উত্তাল তরঙ্গ-বিক্ষোভ, সংগ্রামময় অবিশ্বাস্য জীবনের দুরনত্ম আকুতি। তাঁর কল্পনার বিশাল ভুবনে মাটি, মানুষ, প্রকৃতি, সমুদ্র, আকাশ ও মরুভূমির সীমাহীন বিসত্মার। স্বপ্ন-সাধে সম্পন্ন মানুষ সেখানে নিরনত্মর সংগ্রাম-মুখর। এ রোমান্টিক স্বপ্নাচ্ছন্নতা ও জীবনের কঠিন বাসত্মবতার সমন্বয়ে ফররুখের কবিতায় এক দুরনত্ম আবেগ ও গতিময়তার সৃষ্টি হয়েছে। বাংলা কাব্যে যা নিতানত্ম দুর্লভ। বাংলা সাহিত্যে কোন কবির বর্ণনায়ই এরূপ বিশাল, বিসত্মৃত ইজেলে রং-বিন্যাসের উদাহরণ লক্ষ্যযোগ্য নয়।
ইসলামী ঐতিহ্য ও ভাবধারা ফররুখ-কাব্যের মূল অনুপ্রেরণা ও কেন্দ্রীয় বিষয়। কিন্তু ধমর্ীয় তত্ত্বকথা তাঁর কাব্যে ফুটে ওঠেনি। চিরনত্মন মানবতার সুন্দরতম আদর্শ হিসাবে তিনি প্রতীকী দ্যোতনায় কাব্যময় করে বাসত্মব জীবনানুভূতির সাথে অবিমিশ্র করে তুলেছেন ইসলামের মূল আদর্শ ও প্রাণ-সম্পদ। ফররুখ আহমদ প্রকৃত জীবন-শিল্পী। তাই তাঁর আদর্শ-চেতনার সাথে মানবিক আর্তি, প্রেম-ভালবাসা, আনন্দ-বেদনা, দ্বন্দ্ব-বিক্ষোভ ও আর্তির পাশাপাশি ইসলামী চেতনা কেবল স্বাভাবিক ও সহজ-স্বচ্ছন্দ রূপ লাভ করেছে তাই নয়, হতাশাপূর্ণ জীবন-সংগ্রামে ইসলামী আদর্শ অন্ধকার, নিরাকূল, অথৈ সাগরের বুকে ধ্রুবতারার দু্যতিময় আলোক-রশ্মির বিসত্মার ঘটিয়েছে। কবির নিকট ইসলাম কোন প্রথাগত ধর্ম নয়, সমস্যা-সংকুল পৃথিবীতে এটা স্রষ্টা-প্রদত্ত একমাত্র অভ্রানত্ম জীবনাদর্শ যা যুগে যুগে মানব জাতিকে মুক্তির অনিবার্য পথপ্রদর্শন করে এসেছে।
এ ছাড়া, হাল্কা রসিকতা, ব্যঙ্গ-বিদ্রূপপূর্ণ বুদ্ধিদীপ্ত রচনা এবং শিশুতোষমূলক নানা বিষয়ের বিচিত্র সমাহার লক্ষ্য করা যায় তাঁর কাব্যে। ফররুখের উপলব্ধি ও জীবনদৃষ্টি যদিও স্থির ও সন্দেহাতীতরূপে এক সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যের অভিসারী কিন্তু তাঁর কাব্যের বিষয়বস্তু ব্যাপক, বর্ণিল ও বৈচিত্র্যে অপরূপ। কবি যদিও কল্পনাচারী ও রোমান্টিক ভাবালুতায় আচ্ছন্ন, তবু তাঁর কাব্য-ভাবনা জীবন-অভিজ্ঞতা ও বাসত্মবতার স্পর্শ-বিবর্জিত নয়। তাই দেখা যায়, কবি স্বপ্নচারী, মরুচারী ও সমুদ্রচারী হওয়া সত্ত্বেও বার বার আটপৌঢ়ে জীবনের গণ্ডীতে ফিরে এসেছেন, বাংলার পলিমাটির খোলা প্রানত্মরে, মেঘমেদুর ছায়াচ্ছন্ন পাখি ডাকা সবুজ প্রকৃতির বুকে স্বচ্ছন্দ বিহার করেছেন, বাংলার নিরন্ন, বুভুক্ষ, নিপীড়িত মানুষের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। ফররুখ আহমদকে তাই কখনো একঘেয়ে মনে হয় না। বিষয়বস্তুর এ ব্যাপকতা ও বৈচিত্র্য ফররুখ-কাব্যের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য। উপরোলি্লখিত গ্রন্থের তালিকা থেকে ফররুখ-প্রতিভার শক্তিমত্তা, তাঁর সৃষ্টির ব্যাপকতা ও বিষয়বস্তুর বৈচিত্র্য সম্পর্কে সম্যক ধারণা করা চলে।
বিষয়বস্তুর সাথে কাব্যের আঙ্গিক ও রূপরীতির ক্ষেত্রেও ফররুখ আহমদ বৈচিত্র্য নিয়ে এসেছেন। আধুনিক বাংলা কাব্যের বিভিন্ন শাখা যেমন মহাকাব্য, সনেট, গীতি কবিতা, শিশুতোষ কবিতা, ব্যঙ্গ-রসাত্মক কবিতা, গান-গজল, নাট্য-কাব্য, ব্যঙ্গ-নাটক ইত্যাদি বিভিন্ন ক্ষেত্রে কবির অনুশীলন ও নিপুণ পদচারণা আমাদেরকে যুগপৎ আনন্দিত ও বিস্ময়পুলকে অভিভূত করে। বাংলা সাহিত্যে মধ্যযুগ থেকেই কাহিনী কাব্যের ধারা চলে আসছে। কিন্তু ইউরোপীয় সাহিত্যের অনুকরণে বাংলা কাব্যে মহাকাব্যের সৃষ্টি আধুনিককালে মাইকেল মধুসূদন দত্তের হাতে। মধুসূদনের 'মেঘনাদ বধ কাব্য' বাংলা সাহিত্যের প্রথম এবং সার্থক মহাকাব্য। তাঁর অনুসরণে হেমচন্দ্র, নবীন চন্দ্র, কায়কোবাদ, গোলাম মোসত্মফা প্রমুখ অনেকেই মহাকাব্য রচনার প্রয়াস পেয়েছেন। তবে তাঁরা কেউই মধুসূদনের মত সার্থকতা অর্জনে সক্ষম হননি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মহাকাব্য রচনার চেষ্টা করেননি। মহাকাব্য রচনার ধারা যখন শেষ হওয়ার পথে তখন ফররুখ আহমদ তাঁর 'হাতেম তা'য়ী' রচনা করে বাংলা সাহিত্যে এক অসাধারণ অবদান রাখলেন। মধুসূদনের পরে সম্ভবত এটাই সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য এবং সার্থক মহাকাব্য। ফররুখের পরে অন্য কেউ মহাকাব্য রচনায় হাত দেননি, দেয়ার সম্ভাবনা আছে বলেও মনে হয় না। কারণ, বর্তমান যুগ-পরিবেশ মহাকাব্য রচনার উপযোগী নয় বলে ধারণা করা হয়। যদি তাই হয়, তাহলে বলা যায়, বাংলা সাহিত্যে প্রথম মহাকাব্যের রচয়িতা হিসাবে মাইকেল মধুসূদন দত্ত এবং সর্বশেষ মহাকাব্য রচয়িতা হিসাবে ফররুখ আহমদ স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
বাংলা সাহিত্যে সনেট রচনার ক্ষেত্রেও মধুসূদন হলেন পথিকৃৎ এবং নিঃসন্দেহে সার্থকতম। তাঁর পরে অনেকেই সনেট রচনার প্রয়াস পেয়েছেন। তবে সনেটের দৃঢ়বদ্ধ শিল্পরীতির কারণে এক্ষেত্রে খুব কম সনেট-রচয়িতাই সফল হতে পেরেছেন। তবে সনেট রচয়িতা হিসাবে ফররুখ আহমদের কৃতিত্ব অসামান্য, এ-কথা অনেকেই স্বীকার করেন। ফররুখ আহমদ মূলত রোমান্টিক কবি হওয়া সত্ত্বেও সনেট রচনার ক্ষেত্রে তিনি আশ্চর্যজনকভাবে সফল। নাট্যকাব্য, ব্যঙ্গ-নাট্য, গীতি কবিতা, শিশুতোষ কবিতা, ব্যঙ্গ কবিতা, গান-গজল ইত্যাদি কাব্যের বিভিন্ন শাখায় ফররুখ আহমদ উল্লেখযোগ্য অবদান রেখে গেছেন। এসব ক্ষেত্রে তিনি সর্বদা পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও অনুশীলন করে গেছেন এবং সে জন্যই তিনি একস্থানে কখনো স্থির হয়ে থাকেন নি। কাব্য-সৌন্দর্য ও উৎকর্ষের সন্ধানে কবি সর্বদা ব্যাপৃত থেকেছেন। নিরনত্মর পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও অনুশীলন-প্রবণতা বড় কবির লক্ষণ। এ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ফররুখ আহমদও এক মহৎ শিল্পীর পরিচয় দিয়েছেন। তাই ফররুখ আহমদ এক অনন্য বৈশিষ্ট্যের অধিকারী কালোত্তীর্ণ কবি। বাংলা কাব্যের শ্রেষ্ঠ মৌলিক কবিদের মধ্যে তিনি অন্যতম।
 

copyright @ Farruk Foundation, 2010. Powered By: Versorium